June 9, 2026, 11:47 pm

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত দৈনিক কুষ্টিয়া অনলাইন পোর্টাল
সংবাদ শিরোনাম :
ইউনূস সরকারের সময়কার অধ্যায় পেরিয়ে নতুন সম্পর্কের দিকে ঢাকা-দিল্লি : তথ্য উপদেষ্টা নিয়ন্ত্রণহীন রেস্তোরাঁ বাজার/ দাম বাড়ছে একই, কিন্তু প্রতিদিন ছোট হচ্ছে গ্রাহকের প্লেট কুষ্টিয়ায় চিরকুট লিখে প্রবাসীর স্ত্রীর আত্মহত্যা/এনজিও ঋণ ও প্রবাসজীবনের চাপের নীরব ট্র্যাজেডি সংবাদ বিশ্লেষণ/১১ জেলায় বিজিবির সঙ্গে আনসার বাহিনী দিয়ে সীমান্তে নতুন নিরাপত্তা বলয়, বাড়ছে কৌশলগত গুরুত্ব পোড়াদহ জংশন থেকে অপহৃত ৩ শিশু ঢাকায় উদ্ধার, গ্রেপ্তার ২ এবারও আদালত গ্রহণ করলো না ইউনূস-নূরজাহানসহ ৫ জনের বিরুদ্ধে মামলা অধ্যাপক আবুল বারকাতের শর্ত সাপেক্ষ জামিন বাজারের আগুন, মধ্যবিত্তের দীর্ঘশ্বাস/ সরকার কি পরিস্থিতির গভীরতা বুঝতে পারছে? তিন বগি লাইনচ্যুত, খুলনার সঙ্গে উত্তরবঙ্গের রেলযোগাযোগ বন্ধ রামিসা হত্যা মামলায় সোহেল রানা ও স্বপ্না আক্তারের মৃত্যুদণ্ড

নিয়ন্ত্রণহীন রেস্তোরাঁ বাজার/ দাম বাড়ছে একই, কিন্তু প্রতিদিন ছোট হচ্ছে গ্রাহকের প্লেট

ড. আমানুর আমানের কলাম/
বাংলাদেশের নগরজীবনে রেস্তোরাঁ এখন আর বিলাসিতা নয়, বরং প্রয়োজনীয় সেবার অংশ। কর্মজীবী মানুষ, শিক্ষার্থী, নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে শুরু করে উচ্চবিত্ত—সবার জীবনেই হোটেল-রেস্তোরাঁর ভূমিকা বেড়েছে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে সারাদেশের বিভিন্ন এলাকায় দেখা যাচ্ছে এক নতুন প্রবণতা। খাবারের দাম নানা অজুহাতে আগের থেকে বাড়ানো কিংবা একই মতোই রাখা হলেও প্লেটে কমে যাচ্ছে ভাত, মাংস, মাছ, ডাল কিংবা অন্যান্য ফার্স্টফুডের পরিমাণ। রেস্তোরাঁ মালিকরা বলছেন, এলপিজি ও বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির কারণে তারা বাধ্য হচ্ছেন এ পথে হাঁটতে।
একটি জাতীয় দৈনিকের এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, গত তিন মাসে ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ১ হাজার ৩৫৬ টাকা থেকে বেড়ে ১ হাজার ৯৪০ টাকায় পৌঁছেছে। একই সময়ে বিদ্যুতের দামও বেড়েছে প্রায় ১৭ শতাংশ। ফলে রেস্তোরাঁ খাতের উৎপাদন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ব্যবসায়ীরা দাবি করছেন, বাজার প্রতিযোগিতার কারণে সরাসরি খাবারের দাম বাড়ানো সম্ভব হচ্ছে না। তাই তারা পরিবেশনের পরিমাণ কমিয়ে ব্যয় সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছেন।
প্রথম দৃষ্টিতে যুক্তিটি গ্রহণযোগ্য মনে হতে পারে। কিন্তু বিষয়টি গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সমস্যার পুরো দায় শুধু জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধির ওপর চাপিয়ে দেওয়া যায় না। এখানে সরকারের নীতিগত ব্যর্থতার পাশাপাশি রেস্তোরাঁ মালিকদের ব্যবসায়িক আচরণ ও বাজার নিয়ন্ত্রণহীনতাও সমানভাবে প্রশ্নের মুখে পড়ে।
জ্বালানি ও বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি বাংলাদেশের অর্থনীতিতে নতুন ঘটনা নয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, কেন বারবার সাধারণ ভোক্তাকে এর মূল্য দিতে হবে?
বাংলাদেশে এলপিজি বাজার কার্যত আমদানিনির্ভর। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লে দেশের বাজারেও তার প্রভাব পড়ে। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, সরকার দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারেনি। পাইপলাইনের গ্যাস সংকট, এলপিজি বাজারে অস্বচ্ছতা এবং বিদ্যুৎ খাতে ব্যয়বহুল নীতির কারণে প্রায় প্রতিটি খাতেই উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে।
রেস্তোরাঁ খাতও এর বাইরে নয়। কিন্তু সরকারের ব্যর্থতার খেসারত যদি শেষ পর্যন্ত একজন শ্রমিক, শিক্ষার্থী বা নিম্ন আয়ের ভোক্তাকে দিতে হয়, তাহলে প্রশ্ন উঠবে—মূল্য নিয়ন্ত্রণ ও বাজার তদারকির দায়িত্ব কার?
রেস্তোরাঁ মালিকদের যুক্তি হলো, দাম বাড়ালে গ্রাহক হারানোর ঝুঁকি রয়েছে। তাই তারা খাবারের পরিমাণ কমিয়ে দিচ্ছেন। কিন্তু এখানেই নৈতিকতার প্রশ্ন।
একজন গ্রাহক যখন ২০০ টাকার একটি খাবার কিনছেন, তিনি সেই খাবারের একটি নির্দিষ্ট মান ও পরিমাণের প্রত্যাশা করেন। মূল্য অপরিবর্তিত রেখে গোপনে খাবারের পরিমাণ কমিয়ে দেওয়া আসলে এক ধরনের “অদৃশ্য মূল্যবৃদ্ধি”। আন্তর্জাতিক অর্থনীতিতে এর নাম Shrinkflation— অর্থাৎ পণ্যের দাম একই রেখে পরিমাণ কমিয়ে দেওয়া। এটি আইনগতভাবে সবসময় অপরাধ না হলেও ভোক্তার সঙ্গে স্বচ্ছ আচরণ নয়। কারণ অধিকাংশ রেস্তোরাঁ কোথাও উল্লেখ করছে না যে তারা পরিবেশনের পরিমাণ কমিয়েছে।

রেস্তোরাঁ মালিকদের একটি অংশ দাবি করছেন, তাদের লাভ কমে যাচ্ছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশের অধিকাংশ মাঝারি ও বড় রেস্তোরাঁ খাতে মূল্য নির্ধারণের কোনো কার্যকর নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থা নেই।
একই ধরনের খাবারের দাম এক এলাকায় ১৫০ টাকা, অন্য এলাকায় ৩০০ টাকা—এমন বৈষম্য প্রায় স্বাভাবিক ঘটনা। অনেক ক্ষেত্রে খাবারের প্রকৃত উৎপাদন ব্যয়ের তুলনায় মূল্য নির্ধারণ করা হয় ব্র্যান্ড, লোকেশন ও গ্রাহকের ক্রয়ক্ষমতা বিবেচনায়।
ব্যবসায়িক মহলের অনেকের মতে, রেস্তোরাঁ খাতে বিনিয়োগের তুলনায় লাভের হার এখনও দেশের অনেক শিল্প খাতের চেয়ে বেশি। এমন পরিস্থিতিতে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রথম প্রতিক্রিয়া যদি হয় খাবারের পরিমাণ কমিয়ে দেওয়া, তাহলে প্রশ্ন ওঠে—মুনাফার অংশ থেকে কতটুকু চাপ ব্যবসায়ীরা নিজেরা বহন করছেন?
ব্যবসা মানেই লাভ, কিন্তু প্রতিটি ঝুঁকি ও ব্যয় সরাসরি ভোক্তার ওপর চাপিয়ে দেওয়া কি গ্রহণযোগ্য?
নিয়ন্ত্রণহীন মূল্য নির্ধারণ/
বাংলাদেশে রেস্তোরাঁ খাতের সবচেয়ে বড় সমস্যাগুলোর একটি হলো মূল্য নির্ধারণে কার্যকর নজরদারির অভাব।
একটি ভাত-মাংসের প্লেট, এক কাপ চা, এক বাটি খিচুড়ি বা একটি বিরিয়ানির দাম কীভাবে নির্ধারিত হচ্ছে—তার কোনো সুস্পষ্ট মানদণ্ড নেই। ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর মাঝে মধ্যে অভিযান চালালেও খাবারের মূল্য ও পরিমাণের মধ্যে সামঞ্জস্য রয়েছে কিনা, তা নিয়ে নিয়মিত নজরদারি খুব কমই দেখা যায়।
ফলে একদিকে ব্যবসায়ীরা সরকারের জ্বালানি নীতির সমালোচনা করছেন, অন্যদিকে নিজেরাও বাজারে প্রায় স্বাধীনভাবে মূল্য ও পরিমাণ নির্ধারণ করছেন।
ভোক্তা কোথায় যাবে?
সবচেয়ে বড় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সাধারণ মানুষ। মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত শ্রেণির অনেকেই এখন ঘরের বাইরে খাওয়ার খরচ কমিয়ে দিচ্ছেন। শিক্ষার্থী, অফিসকর্মী ও শ্রমজীবী মানুষ কম খাবার পেয়ে একই মূল্য পরিশোধ করছেন। অথচ তাদের আয় সেই অনুপাতে বাড়েনি।
একদিকে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি, অন্যদিকে খাদ্যের পরিমাণ হ্রাস—দুই দিক থেকেই চাপে পড়ছে ভোক্তা।
সমাধান কী/
বিশেষজ্ঞদের মতে, সমস্যার সমাধানে দুই পক্ষকেই দায়িত্ব নিতে হবে।
সরকারকে জ্বালানি বাজারে স্থিতিশীলতা আনতে হবে, বাণিজ্যিক গ্যাস সংযোগের বাস্তবসম্মত সমাধান খুঁজতে হবে এবং এলপিজি বাজারে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণে খাদ্যের মান, পরিমাণ ও মূল্য নির্ধারণে নজরদারি বাড়ানো জরুরি।
অন্যদিকে রেস্তোরাঁ মালিকদেরও স্বচ্ছ ব্যবসায়িক আচরণ নিশ্চিত করতে হবে। যদি পরিমাণ কমানো হয়, তবে তা স্পষ্টভাবে জানাতে হবে। কেবল মুনাফা ধরে রাখার জন্য গোপনে খাবারের পরিমাণ কমিয়ে দেওয়া দীর্ঘমেয়াদে গ্রাহকের আস্থা নষ্ট করবে।
রেস্তোরাঁ খাতের বর্তমান সংকট বাস্তব। জ্বালানি ও বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি ব্যবসায়ীদের ওপর চাপ তৈরি করেছে, এতে সন্দেহ নেই। কিন্তু একই সঙ্গে এটাও সত্য যে বাংলাদেশের রেস্তোরাঁ খাতে মূল্য নির্ধারণ, মুনাফা ও ভোক্তা সুরক্ষার ক্ষেত্রে দীর্ঘদিনের অস্বচ্ছতা রয়েছে।
ফলে বর্তমান পরিস্থিতিতে শুধু সরকারকে দায়ী করলেও সত্যের একটি অংশ বলা হবে, আবার শুধু ব্যবসায়ীদের দোষারোপ করলেও বাস্তবতা ধরা পড়বে না। প্রকৃত সমস্যা হলো—নীতিগত ব্যর্থতা, নিয়ন্ত্রণহীন বাজার এবং ভোক্তার স্বার্থকে সবচেয়ে কম গুরুত্ব দেওয়ার সংস্কৃতি। আর সেই সংস্কৃতির মূল্য আজও পরিশোধ করছে সাধারণ মানুষ।
+++++
ড. আমানুর আমান, সম্পাদক, প্রকাশক ও মুদ্রাকর, দৈনিক কুষ্টিয়া ও দি কুষ্টিয়া টাইমস

নিউজটি শেয়ার করুন..

Comments are closed.

পুরোনো খবর এখানে,তারিখ অনুযায়ী

MonTueWedThuFriSatSun
1234567
891011121314
15161718192021
22232425262728
2930 
© All rights reserved © 2024 dainikkushtia.net
Maintenance By DainikKushtia.net